ডা. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া
নবজাতক শিশু বিশেষজ্ঞ
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ)
বিসিএস (স্বাস্থ্য),
এমডি, নিওনেটোলজি
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
রেজিস্ট্রার, শিশু বিভাগ
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
২২ নভেম্বর, ২০২৩ ০১:৩৯ পিএম
অভিযোগের দেয়াল নয়, সম্পর্কগুলোর যত্ন নিন
আমাদের সম্পর্কগুলো যত্ন করার জিনিস। সেটা মা-বাবার সাথে হোক, স্ত্রী-সন্তান, ভাই-বোন কিংবা সহকর্মী বা আত্মীয়-স্বজনের সাথে। এটা আগ বাড়িয়ে পুষ্ট করার জিনিস, নিয়মিত সার দিয়ে, পানি দিয়ে যত্নে যত্নে সজীব ও তরতাজা করার জিনিস।
এখন আজব এক কালচার শুরু হয়েছে! আত্মতুষ্টির একটা ঢেকুর তুলে আমরা বলে দেই—‘আমি তো এমনই! আমার কারো খোঁজ নেয়ার অভ্যাস নাই। অন্যেরাই বরং আমার খোঁজ-খবর নেয়। এটা ঐচ্ছিক না, আমার পারসোনালিটিই এমন!’
আসলে এটা ভালো কোনো গুণ না; খুবই বড় একটা সীমাবদ্ধতা। এটা এমনিতে তৈরি হয়নি; এই ঘুণে ধরা সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে আত্মকেন্দ্রিকতা, তারই একটা যৌক্তিক কার্যকারণ এটা। মানুষকে ক্রমশ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত বানিয়ে একটা মানবতাহীন সমাজ তৈরির অপচেষ্টার মহাপরিকল্পনা।
সমাজটা পচে যাচ্ছে। সম্পর্কগুলো পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে। ভাইয়ে-ভাইয়ে কিংবা খুব কাছের রক্তের সম্পর্কেও দেনা-পাওনার হিসাব নিয়ে ক্রমশ দ্বন্দ্ব প্রকট হচ্ছে। অবস্থা খুব জটিল হলে তখন আমরা ভাবতে বসি, কেন এমন হলো! অথচ ঘটনার শুরুটা তখন থেকে নয়; সম্পর্কটা রুক্ষ হওয়া শুরু হয়েছে তারও অনেক বছর আগে। হয়তো কোন ছোট-খাটো ভুল বোঝাবুঝি থেকে; একটা-দুইটা অপ্রাপ্তি কিংবা বৈষম্য থেকে। তখন ছোট দূরত্বগুলো ঘোচানোর চেষ্টা করা হয়নি। বোঝা যায়নি এটা ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে; নিজেরা একটু বসা দরকার; আলাপ-আলোচনা করে ভুলগুলো শোধরানো দরকার।
একটু জড়তা তো থাকেই, সাথে থাকে অনেক ব্যস্ততা। পরে আমরা এর খেসারত দেই আজীবন দূরত্বের দেয়াল তুলে দিয়ে। কথা বলাবলি বন্ধ। দেখাদেখি নেই বছরের পর বছর। ভিতরে সবারই রক্তক্ষরণ হয় প্রিয়মুখগুলোর জন্য। আগুণে জ্বলতে থাকে বুক। কিন্তু আগবাড়িয়ে সামনে আসাটা কঠিন। দুইপক্ষের সব সময় সমান তাড়া থাকে না। বাইরের দুনিয়ার হাজারো মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেন। পারেন না শুধু তাদের কাছে যেতে, যাদের সাথে কেটেছে আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো। যাদের সাথে মিশে আছে জীবনের দামি স্মৃতিগুলো। আহা কী কষ্ট! কি নির্মম নীরব রক্তক্ষরণ হৃদয়ের!
আমরা চাইলে সচেতনভাবে এই ঝুঁকিটা এড়াতে পারি। অধিকাংশ দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারি কিছুটা পরিশ্রম করলে। আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকাটাই যদি নিজের জন্য পছন্দ করে নেই, তাহলে হবে না।
অন্য দশটা ঘোরগ্রস্ত মানুষের মতো নিরাসক্ত আর উদাসীন হয়ে থাকাটা আমাদের কাজ নয়। ক্ষুদ্র অবসর সময়গুলোর যথাযথ বিনিয়োগ করুন। মুহূর্তগুলো মাল্টিমিডিয়া বা ডিজিটাল স্ক্রিনের বিনোদনের জন্য বরাদ্দ করে দেবেন না দয়া করে। তার চেয়ে বরং ওই সময়গুলোকে প্রিয় মানুষদের জন্য বরাদ্দ করুন।
এই ওয়াইফাই আর হাইস্পিড ইন্টারনেটের যুগে স্মার্টফোনের নম্বর লিস্টে থাকা স্বজনদের সাথে কথা বলা খুব কঠিন কিছু নয়। শুধু জড়তা এড়িয়ে নোটিফিকেশনের ফাঁদ পেরিয়ে প্রিয়জনের ফোন নম্বরটা ডায়াল করতে হবে। বাজি ধরে বলতে পারি, একটা নাটক বা সিনেমা দেখে যে আনন্দটা আপনি পাবেন তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভালো লাগা কাজ করবে আপনার; যদি আপনি আপনার একজন কাছের মানুষের সাথে পাঁচ মিনিট মন খুলে কথা বলেন।
এক্ষেত্রে একেকদিন একেকজনকে ফোন দিতে পারেন। মাসখানেকের মধ্যে সবার সাথে যেন একবার কথা হয় অন্তত। দেখবেন, মনটা অনেক হালকা লাগছে। নিজেকে আরেকটু দায়িত্বশীল মনে হচ্ছে।
আমরা চেষ্টা করে, যত্ন করে সজীব রাখতে না চাইলে এক সময় আমাদের সম্পর্কগুলো বিবর্ণ গাছের মতো মৃতপ্রায় হয়ে যাবে। অপ্রাপ্তি আর অভিযোগের দেয়াল ক্রমশ বিদ্বেষ বাড়াবে, পাশাপাশি থেকেও মনগুলো চলে যাবে হাজার আলোকবর্ষ দূরে। হতাশ হয়ে একদিন বলবো, আজব তো সবাই এমন দূরে চলে গেলো কেন! আমরা প্রচণ্ড একা হয়ে গেছি! অথচ আমাদেরও কিছু দায়িত্ব ছিল ...। কাছের মানুষদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা কোনো আনুষ্ঠানিকতা শুধু নয়; এটা বাধ্যবাধকতা।
নিয়মিত খোঁজ-খবর নেয়াটা শুধু অন্যের জন্য এমনটা নয়; নিজের ভালো থাকার জন্যও জরুরি। স্বজনদের কাছে মাঝে মাঝেই যাওয়া, তাদেরকে নিজেদের কাছে দাওয়াত দেওয়া, নিয়মিত কাছাকাছি হওয়া, সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি করা—এগুলো এমনি এমনি সম্পাদিত কোনো কর্মকাণ্ড না। এই কাজগুলোই সম্পর্কের গাছগুলোকে সতেজ করে; আবেগের পাতাগুলোকে সবুজ করে।
আধুনিক সভ্যতা আমাদের লাভ-ক্ষতির নতুন হিসাব চিনিয়েছে। সব কিছু নিজে ভোগ করতে হবে। প্রাইভেসির নামে ক্রমশ নিজেকে আলাদা করতে করতে ভোগবাদের খোপে ঢুকিয়ে ফেলছি। সার্বজনীনতাকে ভুলে গিয়ে জীবনে ভোগের পাঠ নিচ্ছি নিয়ত। এই স্বার্থপরতার বোধ আমাদের ইতোমধ্যেই অসামাজিক করে তুলেছে। এই একা থাকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যে কতো ভয়ংকর তা দেখতে আকাশ গবেষক হতে হয় না।
যদি আমরা ভালো থাকতে চাই, তবে এক সাথে থাকাটাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের কিছু সুবিধা স্যাক্রিফাইস করে হলেও; অন্যকে অভ্যস্ত করাতে কিছুটা বিরক্ত করা লাগলেও। খেয়াল করে দেখুন তো, আপনার কার কথা বেশি মনে থাকে! যার জন্য আপনি কষ্ট করে কিছু করেছেন; আপনার কোন দরকারি কাজ স্যাক্রিফাইস করে যাকে আপনি সাহায্য করেছেন; হয়তো এতে আপনার কিছুটা কষ্টও হয়েছিল। এই কষ্টটাই চমৎকার একটা তৃপ্তিতে পরিণত হয় এক সময়।
ভালো থাকতে চাইলে ভাল রাখুন। আরোপিত কিছু না করে নিয়মিত যোগাযোগটা অভ্যাসের মধ্যে আনার চেষ্টা করুন। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষটাকে প্রথম সালামটা আপনি দিন। অনেক দিন কেউ খোঁজ না নিলে তার প্রতি অভিমান পুষে না রেখে প্রথম ফোনকলটা আপনি দিন। কি মনে হচ্ছে আপনার ইগো ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আপনি অন্যের কাছে ছোট হয়ে যাবেন? মোটেও না এটা আপনার সুখের কারণ হবে, আল্লাহর কাছে আপনার সম্মান বাড়বে; আপনাকে ভালোবাসার মানুষের সংখ্যা বাড়বে সমানুপাতিক হারে।
একটা অসাধারণ সুখবর দিয়ে শেষ করি—
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে ভয় করে, আত্মীয়তার বন্ধন জুড়ে রাখে, তার আয়ু বর্ধিত করা হয়, তার ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করা হয় এবং তার পরিবার-পরিজন তাকে ভালোবাসে।’
আল-আদাবুল মুফরাদ হাদীস/৫৯
এএনএম/